********প্রেমের কবিতা********* – মহাদেব সাহা ছন্দরীতি তোমাদের কথায় কথায় এতো ব্যকরণ তোমাদের উঠতে বসতে এতো অভিধান, কিন্তু চঞ্চল ঝর্ণার কোনো ব্যাকরণ নেই আকাশের কোনো অভিধান নেই, সমুদ্রের নেই। ভালোবাসা ব্যাকরণ মানে না কখনো হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো সংবিধান নেই হৃদয় যা পারে তা জাতিসঙ্ঘ পারে না গোলাপ ফোটে না কোনো ব্যাকরণ বুঝে। প্রেমিক কি ছন্দ পড়ে সম্বোধন করে? নদী চিরছন্দময়, কিন্তু সে কি ছন্দ কিছু জানে, পাখি গান করে কোন ব্যাকরণ মেনে? তোমারাই বলো শুধু ব্যাকরণ, শুধু অভিধান! বলো প্রেমের কি শুদ্ধ বই, শুদ্ধ ব্যাকরণ কেউ কি কখনো সঠিক বানান খোঁজে প্রেমের চিঠিতে কেউ কি জানতে চায় প্রেমালাপ স্বরে না মাত্রায়? নীরব চুম্বনই জানি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছন্দরীতি। নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে, হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে হৃদয়ে রয়েছ গোপনে। বাসনা বসে মন অবিরত, ধায় দশ দিশে পাগলের মতো। স্থির আঁখি তুমি ক্ষরণে শতত জাগিছ শয়নে স্বপনে। সবাই ছেড়েছে নাই যার কেহ তুমি আছ তার আছে তব কেহ নিরাশ্রয় জন পথ যার যেও সেও আছে তব ভবনে। তুমি ছাড়া কেহ সাথি নাই আর সমুখে অনন্ত জীবন বিস্তার, কাল পারাপার করিতেছ পার কেহ নাহি জানে কেমনে। জানি শুধু তুমি আছ তাই আছি তুমি প্রাণময় তাই আমি বাঁচি, যতো পাই তোমায় আরো ততো যাচি যতো জানি ততো জানি নে। জানি আমি তোমায় পাবো নিরন্তন লোক লোকান্তরে যুগ যুগান্তর তুমি আর আমি, মাঝে কেহ নাই কোনো বাঁধা নাই ভুবনে। নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে। পাগলী, তোমার সঙ্গে – জয় গোস্বামী পাগলী, তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোবালি কাটাব জীবন এর চোখে ধাঁধা করব, ওর জল করে দেব কাদা পাগলী, তোমার সঙ্গে ঢেউ খেলতে যাব দু’কদম। অশান্তি চরমে তুলব, কাকচিল বসবে না বাড়িতে তুমি ছুঁড়বে থালা বাটি, আমি ভাঙব কাঁচের বাসন পাগলী, তোমার সঙ্গে বঙ্গভঙ্গ জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে ৪২ কাটাব জীবন। মেঘে মেঘে বেলা বাড়বে, ধনে পুত্রে লক্ষ্মী লোকসান লোকাসান পুষিয়ে তুমি রাঁধবে মায়া প্রপন্ঞ্চ ব্যন্জ্ঞন পাগলী, তোমার সঙ্গে দশকর্ম জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে দিবানিদ্রা কাটাব জীবন। পাগলী, তোমার সঙ্গে ঝোলভাত জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে মাংসরুটি কাটাব জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে নিরক্ষর জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে চার অক্ষর কাটাব জীবন। পাগলী, তোমার সঙ্গে বই দেখব প্যারামাউন্ট হলে মাঝে মাঝে মুখ বদলে একাডেমি রবীন্দ্রসদন পাগলী, তোমার সঙ্গে নাইট্যশালা জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে কলাকেন্দ্র কাটাব জীবন। পাগলী, তোমার সঙ্গে বাবুঘাট জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে দেশপ্রিয় কাটাব জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে সদা সত্য জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে ‘কী মিথ্যুক’ কাটাব জীবন। এক হাতে উপায় করব, দুহাতে উড়িয়ে দেবে তুমি রেস খেলব জুয়া ধরব ধারে কাটাব সহস্র রকম লটারি, তোমার সঙ্গে ধনলক্ষ্মী জীবন কাটাব লটারি, তোমার সঙ্গে মেঘধন কাটাব জীবন। দেখতে দেখতে পুজো আসবে, দুনিয়া চিত্কার করবে সেল দোকানে দোকানে খুঁজব রূপসাগরে অরূপরতন পাগলী, তোমার সঙ্গে পুজোসংখ্যা জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে রিডাকশনে কাটাব জীবন। পাগলী, তোমার সঙ্গে কাঁচা প্রুফ জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে ফুলপেজ কাটাব জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে লে আউট জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে লে হালুয়া কাটাব জীবন। কবিত্ব ফুড়ুত্ করবে, পিছু পিছু ছুটব না হা করে বাড়ি ফিরে লিখে ফেলব বড়ো গল্প উপন্যাসোপম পাগলী, তোমার সঙ্গে কথাশিল্প জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে বকবকম কাটাব জীবন। নতুন মেয়ের সঙ্গে দেখা করব লুকিয়ে চুরিয়ে ধরা পড়ব তোমার হাতে, বাড়ি ফিরে হেনস্তা চরম পাগলী, তোমার সঙ্গে ভ্যাবাচ্যাকা জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে হেস্তনেস্ত কাটাব জীবন। পাগলী, তোমার সঙ্গে পাপবিদ্ধ জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে ধর্মমতে কাটাব জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে পুজা বেদি জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে মধুমালা কাটাব জীবন। দোঁহে মিলে টিভি দেখব, হাত দেখাতে যাব জ্যোতিষীকে একুশটা উপোস থাকবে, ছাব্বিশটা ব্রত উদযাপন পাগলী, তোমার সঙ্গে ভাড়া বাড়ি জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে নিজ ফ্ল্যাট কাটাব জীবন। পাগলী, তোমার সঙ্গে শ্যাওড়াফুলি জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে শ্যামনগর কাটাব জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে রেল রোকো জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে লেট স্লিপ কাটাব জীবন। পাগলী, তোমার সঙ্গে আশাপূর্ণা জীবন কাটাব আমি কিনব ফুল, তুমি ঘর সাজাবে যাবজ্জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে জয় জওয়ান জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে জয় কিষান কাটাব জীবন। সন্ধেবেলা ঝগড়া হবে, হবে দুই বিছানা আলাদা হপ্তা হপ্তা কথা বন্ধ মধ্যরাতে আচমকা মিলন পাগলী, তোমার সঙ্গে ব্রক্ষ্মচারী জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে আদম ইভ কাটাব জীবন। পাগলী, তোমার সঙ্গে রামরাজ্য জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে প্রজাতন্ত্রী কাটাব জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে ছাল চামড়া জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে দাঁতে দাঁত কাটাব জীবন। এর গায়ে কনুই মারব রাস্তা করব ওকে ধাক্কা দিয়ে এটা ভাঙলে ওটা গড়ব, ঢেউ খেলব দু দশ কদম পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোঝড় জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে ‘ভোর ভয়োঁ’ কাটাব জীবন। একবার ভালোবেসে দেখো – মহাদেব সাহা তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো আর এই মুখে কবিতা ফুটবে না, এই কণ্ঠ আবৃতি করবে না কোনো প্রিয় পঙ্ক্তিমালা তাহলে শুকিয়ে যাবে সব আবেগের নদী। আমি আর পারবো না লিখতে তাহলে অনবদ্য একটি চরণ, একটিও ইমেজ হবে না রচিত, তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো তবে কবিতার পান্ডুলিপি জুড়ে দেখা দেবে ঘুরে ঘুরে অনাবৃষ্টি, খরা। তুমি যদি না তাকাও এই চোখ দেখবে না কিছু উজ্জ্বল আলোর ভোর ঘন অন্ধকারে ঢেকে যাবে, সন্ধ্যাতারা মনে হবে মৃত নিষ্পলক চোখ যদি ফিরে না তাকাও মর্মে আর পল্লবিত হবে না কবিতা। তুমি যদি না দাও চুম্বন এই মুখে ফুটবে না ভাষা মরা গাঙে জাগবে না ঢেউ, দুই তীরে প্রাণের স্পন্দন, হবে না শস্যের মাঠে শ্রাবণের ব্যাপক বর্ষণ হৃদয়ে হৃদয়ে আর অঙ্কুরিত হবে না কবিতা, বাজবে না গান। তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো আর প্রকৃতই আমি আগের মতন পারবো না লিখতে কবিতা আমার আঙুলে আর খেলবে না জাদুর ঝিলিক, এই শাদা পৃষ্ঠা জুড়ে ফুটবে না জুঁই আর চাঁপা। একবার ভালোবেসে দেখো, একবার কাছে ডেকে দেখো আবার আগের মতো কীভাবে ফুটাই এক লক্ষ একটি গোলাপ অনায়াসে কীভাবে আবার অনুভূতি করি সঞ্চারিত, একবার ভালোসেবে দেখো আবার কীভাবে লিখি দুহাতে কবিতা। প্রেমিক জনের চিঠি – শ্রীজাত ওই কথা কি এভাবে কেউ বলতে পারে? হঠাৎ করে, সিড়ির বাঁকে, অন্ধকারে নিশ্বাস নাক গন্ধ পোহায়, চনমিয়া… ঘুপচি মতাে মুঠোর ভেতর একলা টিয়া ছটফটাচ্ছে দেখতে পাচ্ছি। চাই না উড়ান? ঠাকুর ঘরের চাল থেকে পাহাড়চূড়া? ঠোটের উপর ঘাম মুছে নাও। ডাকছে নীচে। নখের ঘরে কেটেছে হাত, ওষুধ মিছে। বুকটুকুনির ওঠানামায় ধুকপুকুনি জড়িয়ে নেওয়ার মন হলে কে ছাড়ত শুনি? কিন্তু এখন সবটা ইচ্ছে করছে না যে হয়তো হঠাৎ উড়ে টিয়া, ভিড়ের মাঝে… এইটুকু তো অতৃপ্তি দাও প্রেমিক জনে, একটা চুমু না-খাওয়া থাক, এই জীবনে! একটি মেয়ের জন্য – রুদ্র গোস্বামী একা ফুটপাথ আলো ককটেল ভিজে নাগরিক রাত পদ্য। তুই হেঁটে যাস কাঁচ কুয়াশায় জল ভ্রূণ ভাঙা চাঁদ সদ্য। আমি প্রশ্ন তুই বিস্ময় চোখ চশমার নীচে বন্ধ। ঠোঁট নির্বাক চাওয়া বন্য আমি ভুলে যাই দ্বিধা দ্বন্দ্ব। জাগা রাত্রি ঘুম পস্তায় মোড়া রূপকথা পিচ রাস্তা পোষা স্বপ্ন ছিঁড়ে ছারখার প্রিয় রিংটোন লাগে সস্তা। তুই সত্যি আরও সত্যি তুই শিশিরের কুঁড়ি পদ্ম। বাকি মিথ্যে সব মিথ্যে চেনা চার দেয়ালের গদ্য।
0 মন্তব্যসমূহ